কালো বিদ্যা ও অপসাধক (অঘোরী) এবং তাদের অদ্ভুত জীবনধারা!

অঘোরী

আমাদের এই ধরিত্রী সৃষ্টির শুরু থেকেই অদ্ভুত সব কিছু ঘটে যাচ্ছে এখানে, আর সভ্যতার বিংশ শতাব্দীতে এসে চতুর্থ ডাইমেনশনের বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণী হয়েও আমরা কিছু যায়গায় ঠিকি আটকে যাই বার বার। কিছু রহস্য, কিছু ভেলকি, কিছু মানুষ আর এই বায়বীয় মহা সমুদ্রে ভাসমান আমাদের এই ছোট পৃথিবী আর এই প্ল্যানেটে বাস করা কিছু মানুষের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, যেখানে বিজ্ঞান ও থমকে যায়। হ্যাঁ এমনি কিছুর নজির আজ আপনাদের দেব।

ব্ল্যাক ম্যাজিক, স্যটানিজম নিয়ে আগেও লিখেছি, পড়তে এখানে ক্লিক করুন স্যাটানিজম শয়তানি বিদ্যা বা ব্লাক ম্যাজিক

তবে এই লেখাটা কিছুটা ভিন্ন ধরনের। (অঘোর) শুনেছেন এই শব্দ? শুনে থাকলে আসুন একটু বিস্তারিত জানি, অ+ঘোর=অঘোর। ঘোর শব্দের অর্থ হল কোন কিছু নিয়ে মগ্ন থাকা বা মস্তিষ্ককে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ওই বিষয়ে মগ্ন রাখা। আর অঘোর হল অন্ধকারের বিলয় বা যার কোন ভয় নেই যার কোন ঘোর নেই সে হল অঘোর। অথবা যার কিছু নিয়ে ভাবার সময় নেই সে হল অঘোর। অঘোর হল এক ধরনের গোষ্ঠি বা সম্প্রদায় হিন্দু ধর্মের, যারা অপদেবতার পূজারী বা সাধক এদের বলা হয় অঘোরী সাধক বা নাগা সন্ন্যাসী।

অঘোরী
অঘোরী সাধক- Image Source: Flickr

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণঃ

আসুন এবার একটু ঘুরে আসি প্রাচীন বা বৈদিক হিন্দু ধর্ম থেকে। প্রতিটা ধর্মে বলা আছে কিভাবে ধ্বংস হবে আমাদের এই মহাবিশ্ব এবং কে কিভাবে এই ধ্বংস করবে। তেমনি হিন্দুধর্মে বেদ গ্রন্থে, শিব পুরাণ,উপনিষদ এসব গ্রন্থে উল্লেখ আছে The Godes of Death শিব এর কথা তিনি ধংশের দেবতা এবং মহা শক্তিমান তথাকথিত উল্লেখ আছে এক দেবীর কথা (কালি) কালি শক্তি ও অপশক্তি কূলের দেবী, আর শিব ও কালির সাধনায় মত্ত হয়ে জগৎ শংসার ভুলে শুধু তাদের সাধনায় সিদ্ধ যারা তারাই হল অঘোরী।

অঘোরী নাম শুনলেই আঁতকে উঠবে যা এদের দেখেছে,এরা শ্বশ্মানচারী সারা গায়ে থাকে চিতা ভস্ম,এদের খাবারের তালিকায় কোন বাছ নেই পোরানো মানুষের মরা থেকে পশুর মল মূত্র এসবই তাদের কাছে খাবার। আর এরা চরস গাজা বা মদ ও খেয়ে থাকে কিছু ডকুমেন্টারি দেখে জানা যায় এই নেশার সমগ্রি স্বভাবতই তাদের তন্ত্র মন্ত্রের কাজেও সমান ভাবে প্রয়োজন।

অঘোরীদের মতে “যেখানে মানুষের যাত্রা শেষ সেখান থেকে অঘোরীদের যাত্রা শুরু”, মানে কি এ কথার? হ্যাঁ বলছি, তবে আগে জেনে নেই অঘোরীদের কিছু ক্ষমতা ও কার্যকলাপ সম্পর্কে। এরা কখনো যৌনাচার করে না যার অর্থ দাড়ায় ব্রহ্মচর্য।

অঘোরীরা প্রেতসিদ্ধ প্রেত চালনায় এদের বিশেষ ক্ষমতা আছে, ভবিষ্যৎবাণী, রোগ নিরাময়, সম্মোহন বা কারো অযাচিত ক্ষতি সব কিছুর নজির আছে তাদের।

শোনা যায় এরা নরবলি দিয়ে থাকে কোন বিশেষ তিথিতে ইষ্টদেবকে সন্তুষ্ট করতে বা নিজের শরীর থেকে রক্ত দান করে।

অঘোরীরা নগ্ন অবস্থায় বেশি থাকে, তার কারণ হল তারা মানে প্রকৃতিগত সব কিছুকে তাই প্রকৃতি মাতা তাদের যেভাবে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছে তারা তাতেই অভ্যস্ত হওয়ার তালে থাকে। এবং তারা প্রকৃতিতে কিভাবে অল্প রসদে টিকে থাকা যায় সেই জীবনপথ ধরে চলেন।

ভাবতেই অবাক লাগে অঘোরীদের বেশির ভাগ আচরণই মানুষের মনে ভীতির উদ্রেক ঘটায় তবে অঘোরীরা কারো ক্ষতি করে না উপরের কথায় আসা যাক কেন তারা মানেন “মনুষ্য যেখানে শেষ অঘোরী সেখান থেকে শুরু” অঘোরীরা বিশ্বাস করেন শিবের বৈনাশিক রূপ, এক তীব্র শৈব ভাবনা থেকে তারা শিব অনুসারি জীবন যাপন করেন এবং শ্বশ্মান বাস তার প্রধান।

নরকপাল সঙ্গে রাখা, চিতা ভস্ম গায়ে মাখা,পচা নোংরা খাবারে অভ্যস্ত হওয়া বাস্তবিক অর্থে ইন্দ্রিয় জয় করা। ১৭ শতকে সন্ন্যাসী বাবা কিনারামের মাধ্যমে এই আচার গুলো তাদের মধ্যে এসেছে বলে তারা মানে। এর বাইরে অঘোরীরা নিয়মিত শব সাধনা করেন এবং মরার গা থেকে হার খুলে নিয়ে তা ধারণ করেন, নরকপাল (মানুষের মাথার খুলি) তাদের কাছে এক মূল্যবান জিনিস এটিকে তারা পানপাত্র হিসেবেও ব্যবহার করেন।

মদ্যপান, গাজা সেবন অঘোরীরা সাধনার অঙ্গ হিসেবে মনে করেন। অনেকেই মনে করেন অঘোরীরা কালো জাদুতে পারদর্শী এবং তারা ক্ষতি করবে কিন্তু না,আসলে কোন অলৌকিকতা প্রদর্শন করা তাদের কাজ নয় তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য মোক্ষলাভ, অর্থাৎ জীবন ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ। বলাই বাহুল্য এই লক্ষ ভারত,নেপালের সকল আদ্ধাত্বমার্গের সকলেরই তাই এখানেই অঘোরীরা সকল সন্নাসীভাগের এক অংশ হিসেবে দাড়ায়।

aghoris
Image Source: ibtimes.co.uk

অঘোরী দের উৎপত্তিঃ

মধ্যযুগীয় কাশ্মীরি কাপালিতন্ত্র থেকেই অঘোরীদের উৎপত্তি। তাছাড়া কিনারামের ঐতিহ্যের কথা সব অঘোরীই সিকার করে। এদের প্রাচীন নাম কাল মুখ। অঘোরীরা শক্তির উপাসক তাই এরা কালি বা তারার উপসনা করে থাকেন, কিন্ত তাদের আদর্শ শিবত্ব শিব এর পূজা ছারাও তারা কাল ভৈরব,মহাকাল বীরভ্রব ইত্যাদির পূজা করে থাকে।

অঘোরীরা মুক্তপুরুষ এই ধরণীর কোন ভেদ রেখা তারা মানেন না এমনকি পবিত্র অপবিত্রতার ভেদাভেদও না, কোন বন্ধনে তারা আবদ্ধ নয়। তারা মানেন যেকোনো বস্তুতেই ঈশ্বর বিদ্যমান,এটা অঘোরীদের নিশ্চিত বিশ্বাস এই সর্বেসর্বার তাদের মধ্যে অনুপম মাধুর্যের জন্ম দেয়।

কুম্ভমেলা হিন্দুদের একটি বিশেষ উৎসব যা ১২ বছর পরে একবার আসে যখন সূর্য,বৃহস্পতিগ্রহ ও চন্দ্র এক রেখায় বরাবর থাকে তখন হয় কুম্ভ মেলা আর এই মেলা অঘোরীদের মহা উৎসব। লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন এ উতসবে যোগ দেয় সারা পৃথিবী থেকে  যা ইউনেস্কো পরিসংখ্যানে পৃথিবীর সব থেকে বর মানুষের সমাগম ময় । এ উৎসব উদযাপিত হয় হরিদ্দুয়ার,আহলাহাবাদে গঙ্গার তীরে।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে অঘোরীরা কখনওই খারাপ ব্যবহার করেন না। তাদের দূরে সরিয়েও রাখেন না। কাশীতে তাঁদের মূল সাধন ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সদাশয়। বহুপ্রকার ভেজ ও জৈব ওষুধের জ্ঞান তাদের করায়ত্ত। বিপন্ন মানুষকে সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে তারা দ্বিধা বোধ করেন না। সর্বোপরি, অঘোরীরা একান্তভাবেই নির্বিরোধী এক সম্প্রদায়। তাই আপাত-বীভৎসতাগুলিকে মাথায় রাখেন না সাধারণ মানুষ। অঘোরীরা পূজিত হন সর্বত্রই।

অঘোরীরা কখনো ধর্ম অথবা সমাজ বিরোধী নন। তারা ভদ্র সমাজ নিয়ে ততটা মাথাও ঘামান না। কাউকে জোর করে অঘোরী সন্যাসী বানানো হয়েছে এমন নজিরও কোথাও পাওয়া যায় নি। তার মানে তাদের দল ভারি করারও কোন প্রয়াস নেই। নিজের একান্ত ইচ্ছা হলেই কেউ তার সাধনা করতে পারে, সন্যাসী জীবন বেছে নিয়ে তাদের নিয়ম কানুন মানতে পারে। তার জন্য হয়তো বিশাল নীতিমালার সম্মুখীনও হতে পারে।

3,941 total views, 6 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: