অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এক ঐতিহাসিক নির্মম সত্য।

অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প

অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প

সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর নির্মম যুদ্ধ হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যা প্রায় ৬ বছরেরও অধিক সময় ধরে চলছিলো। এটি একটি বিস্তৃত যুদ্ধ যাতে ৩০ টি দেশের প্রায় ১০ কোটিরও বেশি সামরিক বাহিনী অংশগ্রহণ করে। পৃথিবীর ইতিহাসের এ নৃশংস যুদ্ধে প্রায় ৮ কোটিরও বেশি মানুষ মৃত্যু বরন করে। নাৎসি বাহিনীর পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড দখল করে সেখানে অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন বাহিনী নামে একটি বাহিনী গড়ে তুলে। যা ছিল বহির্মুখী ক্যাম্পগুলোর একটি নেটওয়ার্ক। প্রথমে এখানে পোলিশ রাজনৈতিক বন্দিদের রাখা হতো। এ ক্যাম্পের প্রায় ৯০% লোক ছিল ইহুদি। সেই ক্যাম্পে জাইক্লন বি নামে একধরনের কিট নাশকের গ্যাস ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। প্রায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ১.১ মিলিয়ন মানুষ এ কীটনাশকের কারণে মারা গিয়েছিলো। এছাড়াও এ ক্যাম্পের অন্য নির্বাসিতরা হলেন ১৫০০০০ পোলিশ, ২৩০০০ রোমান এবং সিনটি, ১৫০০০০ সোভিয়েত বন্দি যুদ্ধ, ৪০০ জন যিহবার সাক্ষী এবং কয়েক হাজার বিভিন্ন জাতীয়তা সহ সংখ্যা লঘু। এদের মধ্যে অনেকেই সংক্রমক রোগ, বিনা চিকিৎসা, অতিরিক্ত শ্রম, স্বতন্ত্র মৃত্যু দণ্ড এবং আরও বিভিন্ন কারণে মারা যায়। এভাবে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের পর ১৯৪৫ সালের ২৭ জানুয়ারী ক্যাম্প থেকে বন্দিদের মুক্তি দেয়া হয়। তাই এ দিনটি প্রতি বছর আন্তর্জাতিক উৎসব স্মৃতি দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের শায়েস্তা করার জন্য নাৎসি বাহিনী যে বিশাল ক্যাম্প পরিচালনা করেন সেটাই অশ্চিজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নামে পরিচিত। সে ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ লোককে নানা ধরনের নির্যাতন আর বিভিন্ন নৃশংস পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়, যা ইতিহাসের পাতার একটি কালো অধ্যায়।

অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প মিউজিয়াম
অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প মিউজিয়াম– Image Source-thoughtco.com

ইতিহাসঃ

নাৎসি বাহিনী মূলত জার্মানের একটি আতংকের নাম। এ বাহিনী নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ নিয়ে গড়ে তুলেন তৎকালীন জার্মানির দুধর্ষ শাসক এডলফ হিটলার। সে জার্মানে তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার লক্ষে এবং তার টিকে থাকার জায়গাকে শক্ত করার জন্য জার্মান ইহুদিদের উপর নির্যাতন চালায়। যেন তারা দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। জার্মানি নাৎসি বাহিনী ধীরে ধীরে ইহুদিদের দেশ ছাড়ার সব ধরনের বন্দোবস্ত করতে লাগলো। ১৯৩৩ সালের ৭ই এপ্রিল পেশাগত সিভিল সার্ভিস পুনরুদ্ধার আইন পাশ করা হয়। এ আইনের আওতায় এনে ইহুদি আইন পেশাজীবীদের সিভিল সার্ভিস থেকে বাদ দেয়া হয়। এভাবে অন্যান্য পেশা থেকেও ধীরে ধীরে ইহুদিদের বাদ দেয়া হয়। ইহুদিরা যেন দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয় সে জন্য তাদেরকে শাসক দিয়ে অত্যাচার এবং অর্থনৈতিক ভাবে চাপের মুখে রাখা হয়। এমনকি তাদের ব্যবসা বাণিজ্য করা, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া থেকে বিরত রাখা সহ সবধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে সমাজ থেকে ইহুদিদের বহিষ্কার করে। এভাবে ইহুদি এবং জার্মানি সংখ্যা লঘুদের জার্মান নাগরিত্ত থেকে আলাদা করে দেয়া হয়। নাৎসিরা পোলিশ নেতাদের পাশাপাশি ইহুদি, পতিতা, রোমানিয়ান এবং মানুষিক রোগীদের হত্যা করেছিলো। এর কিছু দিন পর নতুন এলাকা দখল করার জন্য হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। সেখানে বসবাস করে ইহুদি আর স্লেভকে নিপাত করতে চায়।

জিপসি ক্যাম্প:

অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প একটি বিশাল ক্যাম্প ছিল। তাই পরিচালনার সুবিদার্থে একে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা হয়। অশ্চিজ১,অশ্চিজ২ ও অশ্চিজ৩ নামে তিনটি ক্যাম্প বিভিন্ন সময়ে পরিচালনা করা হয়।নাৎসি বাহিনীর বিভিন্ন কমান্ডাররা বিভিন্ন সাইট পরিচালনা করার দায়িত্ব নেয়। ১৯৪২ সালের ১০ই ডিসেম্বর, এ সময়ে হিটলার অশ্চিজ, সানটি ও রোম সবাইকে ক্যাম্পে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রোমের একটি পৃথক ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছেল যা জিপসি ক্যাম্প নামে পরিচিতও। ১৯৪৪ সালে এখানে ২৩০০০ জিপসিকে অশ্চিজ ক্যাম্পে আনা হয় যাদের মধ্যে ২০০০০ লোক গ্যাস চেম্বারের গুলিতে নিহত হয়। জিপসি বন্দিদের মূলত নির্মাণ কাজের লাগানো হতো। তাই অতিসত্বর এবং অপুষ্টির কারনে হাজার হাজার টাইফাসের মৃত্যু হয়।

অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প
অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প– Image Source-thoughtco.com

মৃত্যুর মিছিল, নির্বাসন এবং সোভিয়েত মুক্তি:

১৯৪৪ সালের মাঝামাঝিতে হিমলার যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। সশ্মশান চত্বরের বিল্ডিং ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং গন কবর সহ হত্যার সকল প্রমাণ মুছে ফেলার আদেশ দেয়া হয়। ক্যাম্প থেকে বন্দিদের আগ মুহূর্তে বেশ কয়েকটি ভবন পুড়িয়ে দেয়া হয়। কানাডা ব্যারাকের লুণ্ঠিত পণ্যগুলি জার্মান অভ্যন্তরীণ স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর ২০শে জানুয়ারি, গুদামঘর গুলো ভয়াবহ আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এ অগ্নিকান্ড কয়েকদিন ধরে চলে। ১৯৪৫ সালের ২৬শে জানুয়ারি, সোভিয়েত আক্রমণের একদিন আগে বিরকেনাউএর শেষ বিস্ফোরকটি বিস্ফোরণ দ্বারা ভেঙ্গে ফেলা হয়। সকল শিবিরে নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ক্যাম্পের কমান্ডারদের চার্জ শিট দেয়া হয় যেন একজন একজন বন্দিদেরও বাঁচতে না দেয়া হয়। অনেক বন্দিদের নির্বাসিত করা হয়। এরপর অনেক বছর যুদ্ধ চলার পর সোভিয়েত মুক্তি পায়।

জাইক্লন বি কীটনাশকের কৌটা
জাইক্লন বি কীটনাশকের কৌটা– Image Source-thoughtco.com

যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থা:

১৯৪৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি রেড আর্মি দ্বারা সম্পূর্ণ ক্যাম্প মুক্ত করা হয়। ক্ষুদার্ত বন্দিদের জন্য পরদিন সকালে স্বেচ্ছাসেবকরা এক ট্রাক রুটি নিয়ে আসে। অসুস্থদের সহায়তা প্রদানের জন্য পোলিশ রেড ক্রস হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। হাসপাতালটিতে ২০টি দেশের ৪৫০০ রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এদের বেশির ভাগই ইহুদি। এখানে প্রায় ৫০০ রোগীর মৃত্যু হয়। তাদের বেশিরভাগই সংক্রামক রোগ, রক্ত ক্ষরণ, গর্ভাবস্থা এবং টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত ছিল। এছাড়াও স্বেচ্ছাসেবকরা হাসপাতালের কক্ষ পরিষ্কার করা, রোগীদের কাপড় ধোঁয়া, খাবার রান্না করা এবং মৃতদের কবর দেয়ার কাজে নিযুক্ত ছিল। হাসপাতালের পরিচালক নিজে গ্রামে গ্রামে গিয়ে তাদের জন্য দুধ সংগ্রহ করেন। কিছু অনাথ শিশুদের স্থানীয় বাসিন্দারা আশ্রয় দেন।

পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের শাস্তি:

কমপক্ষে ৪০২ জন বন্দি অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে পালাতে চেষ্টা করেছিলো। বেশিরভাগ পোলিশরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলো। অবশ্য তাদের ভাগ্যে কি হয়েছিল তা অজানা। আর পালিয়ে যেতে চাওয়া বন্দিরা ধরা পড়লে তাঁদের শাস্তি ছিল অনাহারে মৃত্যু। বন্দিরা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাবার জন্য মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধরনের সাহসী পদক্ষেপ নিতো । এমনকি মাঝে মাঝে রক্ষীদের পোশাক পরে পালাতে চেষ্টা করতো। কিন্তু ধরা পরলেই মৃত্যুদণ্ড হতো তাদের সাঁজা।

এভাবে বিভিন্ন রকম হত্যাযজ্ঞ, নির্মমতা আর নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারের সাক্ষী হয়ে থাকে অশ্চিউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। ১৯৪৭ সালের ১ জুলাই পোলিশ সরকার একটি স্মারক স্থাপন করার আইন পাশ করে। অশ্চিভজ ক্যাম্পকে পরিণত করা হয় বিরকেনাউ মিউজিয়ামে। সেখানে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সে প্রদর্শনীতে বন্দিদের ব্যবহৃত মগ, চুল,জুতা এবং সুটকেস ইত্যাদি প্রদর্শন করা হয়। UNESCO এ ক্যাম্পকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে যোগ করে। ২০১১ সালে এ সাইটের ভিজিটর ছিল ১,৪০০, ০০০।

এ মিউজিয়াম থেকে যদি কেউ কোন মাটির আইটেমও চুরি করে তাহলেও তাকে পুলিশ চার্জ করবে। এছাড়াও ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

ইতিহাসের সাক্ষী অশ্চিভজ মিউজিয়ামটি তাই প্রচুর দর্শনার্থীর ভীড়ে সবসময় লোকারণ্য থাকে।

তথ্য সুত্রঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Auschwitz_concentration_camp

1,269 total views, 3 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: