অ্যানিমেশন ও এর ইতিকথা

Animation

মানুষের কল্পনা সীমাহীন।এই কল্পনার জগতে আমরা সৃষ্টি করি আমাদের মনের মতো কিছু গল্প, কিছু চরিত্র। কখনও কখনও নিজস্ব সৃষ্ট চরিত্র বা গল্প গুলো বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায় না। কল্পনাকে জীবনের ছবিতে আনয়ন করার শিল্পই হচ্ছে অ্যানিমেশন।

অ্যানিমেশন এর ইতিহাস খুব ছোট নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে উন্নতি হয়েছে অ্যানিমেশন তৈরি করা কৌশলগুলোতে, বেড়েছে এর ব্যবহার এবং আমরা পেয়েছি নতুন নতুন কিছু চরিত্র আর গল্প।
প্রতি বছর ২8 শে অক্টোবর অ্যানিমেশন দিবস উদযাপন করা হয়। আজ জানবো অ্যানিমেশনের আদ্যোপান্ত ইতিহাস। চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক-

 

যাত্রা শুরু

1900: প্রথম অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম

1900 সালে নয়, এর ও বছর কয়েক আগেই অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করেছিল। তবু 1900 সালে নির্মিত ফ্যানটামাসগোর্রিকে সর্বপ্রথম সত্যিকারের অ্যানিমেটেড ফিল্ম বলে মনে করা হয়। চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ছিলেন এমিল কোহল। তিনি ছোট্ট চলচ্চিত্রটির জন্য একটি অক্ষর এবং অন্যান্য বস্তুর রূপান্তরকারী একটি স্টিক চিত্র অনুসরণ করেন। সেই সময়ে, চকবোর্ডের লোকসঙ্গীতের ব্যঙ্গচিত্রগুলো খুব জনপ্রিয় ছিল। তাই অ্যানিমেশনের জন্য অঙ্কনগুলিও নেতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল যাতে চকবোর্ডের অঙ্কনটি জীবন্ত করে তোলা যায়।

1910-এর দশকে: রোটোস্কোপিং যোগ করে নতুন মাত্রা

সময় যেমন থেমে থাকে না ঠিক তেমনইভাবে প্রযুক্তিও থেমে থাকে না। একজনের চেষ্টাকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় আরেকজন। এইভাবে চলতে থাকে অগ্রগতির যাত্রা। এমিল কোহলের পথকে সামনে নিয়ে যায় ম্যাক্স ফ্লেইশার। 1915 সালে, ম্যাক্স ফ্লেইশার গড়ে তুলেন রোটোস্কোপ টেকনিক। যা লাইভ-এভিয়েশন ফুটেজের স্টাইল থেকে পরিসংখ্যান সনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে অ্যানিমেটেড টুকরাগুলি আরো বাস্তবসম্মত, তরল গতি লাভ করে। এর ফলে অ্যানিম্যান্টদের চলমান গঠনগুলো নিখুঁতভাবে বুঝতে সহায়তা করেছিল। Fleischer 1934 সালে তাঁর টেকনিক অবাধে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়।

1920-এর: ঐতিহ্যবাহী ওয়াল্ট ডিজনির আবির্ভাব

অ্যানিমেশনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু করে ওয়াল্ট ডিজনি যার চমৎকার সৃষ্টি হলো মিকি মাউস।
অ্যানিম্যাটর ওয়াল্ট ডিজনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ওয়াল্ট ডিজনি নামে নিজের স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। সময়টা ছিল 1928, যখন মিকি মাউস ধীরে ধীরে জনগণের হৃদয়ে দখল করে নিতে শুরু করে। যার কিছু চরিত্র যেমন মিনি মাউস, গোফি, ও ডোনাল্ড ডক সিরিজ আজও বর্তমান।

 

অ্যানিম্যাটেড ফিল্ম

1930-এর দশকে: প্রথম দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র

1930-এর দশকের গোড়ার দিকে, “Rubber hose” অ্যানিমেশন শিল্পের উপর প্রভাব বিস্তার করে, বিশেষ করে জাজ সঙ্গীত যা ঐ সময়ে খুব জনপ্রিয় ছিল। এরপরই 1937 এ মুক্তি পায় Disney’s Snow White and Seven Dwarfs . এটি প্রথম দীর্ঘ চলচ্চিত্র যা হাতে-আঁকা অ্যানিমেশন দিয়ে তৈরি হয়েছিল। এই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার জন্য ডিজনিকে ভীষণ কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। এমনকি এই ছবির খরচ পরিশোধ করতে গিয়ে তার নিজের বাড়ি বন্ধক রাখতে হয়েছিল। যাই হোক, অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে অবশেষে এই ছবিটি অসাধারণ সাফল্য লাভ করে এবং ডিজনি সিনেমার জগতে আরো অনেকের আসার পথ তৈরি করে দেয়!

1940-এর দশক: টেলিভিশন জগতে অ্যানিমেশনের প্রবেশ

1940 এর আগে শুধুমাত্র চলচ্চিত্র থিয়েটারে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রগুলো দেখা যেতো । Crusader Rabbit নামে একটি সিরিজ টেলিভিশনে প্রথম চালু হয়। এটির নির্মাতা ছিলেন Jay Ward। পরবর্তীতে তিনি The Rocky এবং Bullwinkle Show ও নির্মাণ করেন।

1950-এর দশকে: স্টোপ – মোশন পদ্ধতির ব্যবহার

কম্পিউটার-জেনারেটেড ইমেজ (CGI) ব্যবহারের পূর্বে, অ্যানিমেশনের স্টোপ-মোশন পদ্ধতি বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা হতো। এর সাহায্যে একজনকে দৈত্যকার পোশাক পড়ানো, চকচকে চেহারা করা এবং একটু কম ভীতিজনক এমন ছবি তৈরি ইত্যাদি কাজ করা হতো। Beneath the Sea, The Beast ছবিগুলোতে দৈত্যকার দৃশ্য সৃষ্টির জন্য স্টোপ -মোশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

1960: কার্টুনের জনপ্রিয়তা

একদিকে অ্যানিমেশনের উন্নয়ন ঘটে যাচ্ছে আর অন্য দিকে গত কয়েক দশক ধরে রঙিন টিভি বাজার দখল করে যাচ্ছে। রঙিন টিভির আবিষ্কার গণমাধ্যমে অ্যানিমেশনের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিলো। অ্যানিমেশনের জগতে অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এলো। টিভিতে প্রচারিত The Flinstones কার্টুনটি বাচ্চাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। অ্যানিমেশনের গতি বাড়ালো Xerography। Hand-inking পরিবর্তে সরাসরি অ্যানিমেশন সেলে প্রিন্টিং এনিমটর এর আঁকা ছবি মূদ্রন করে ব্যবহার করা শুরু হয়।

1970: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অ্যানিমেশন

অ্যানিমেশন কি শুধু বাচ্চাদের জন্য? মোটেও না। 1970 এর দশকে নির্মাতারা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও পরীক্ষামূলকভাবে মূভি তৈরি করেন। রবার্ট ক্রাম Fritz the Cat নামের একটি অ্যানিমেটেড কমেডি চলচ্চিত্র রূপায়িত করেছিলেন। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো গতানুগতিক চলচ্চিত্র না হয়েও চলচ্চিত্রটি অসাধারণ সাফল্য লাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় মাত্র কয়েক বছর পরে R- rated নামক একটি সিকুয়েল অনুসরণ করে তৈরি করা হয়।

1980: জাপানের বড় স্পেস অপেরা

কোনও সন্দেহ নেই যে আজকের অ্যানিমেশনের একটি বিশাল অংশ হচ্ছে জাপানী অ্যানিমেশন যা সাধারণভাবে এনিমে নামে পরিচিত। কয়েক দশক আগে জাপানি অ্যানিমেশন শিল্প কিছুটা সঙ্কুচিত হয়েছিল। পরে স্টার ওয়ার ফ্রাঞ্চাইজির বাণিজ্যিক সাফল্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে স্পেস অপেরার মোবাইল সুট গন্ডাম ( Mobile Suit Gundam) এবং স্পেস ব্লেটশিপ ইয়ামাতো( Space Battleship Yamato) কে নাটকীয় চলচ্চিত্র হিসেবে পুনর্জাগরণ করা হয়। 1980 সালের শুরুতে “এনিম বুম” জাপান, ইউএসএ সহ পুরো বিশ্বে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে!

1990: কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহার

কম্পিউটার প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে উনবিংশ শতাব্দীতে অ্যানিমেশনের ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। ওয়াল্ট ডিজনি এর Rescuers Down হচ্ছে কম্পিউটার অ্যানিমেশন প্রোডাকশন সিস্টেমের সাহায্যে তৈরি করা প্রথম চলচ্চিত্র। এই ছবিতে গতানুগতিক অ্যানিমেশন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়নি। ঠিক একই বছর, Toy Story নির্মাণ করা হয় যা সম্পূর্ণরূপে কম্পিউটার-অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ছিল। এই চলচ্চিত্রের ছায়াকরণ এবং রংঙের মিশ্রনের শৈল্পিক কৌশলগুলি এতোটাই উন্নত ছিল যা পুরানো ফর্মের অ্যানিমেশন ব্যবহার করে সম্ভব ছিল না।

এই সময়টা অস্ট্রেলিয়ার অ্যানিমেশনের জন্য খুব চমত্কার সময় ছিল। 1992 সালে তাদের মুক্তি পাওয়া অতি প্রিয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দুটি চলচ্চিত্র হচ্ছে FernGully: The Last Rainforest এবং Blinky Bill: The Mischievous Koala.

২000: ফ্ল্যাশ ক্রেজ

সহস্রাব্দের নতুন ভোরে, বেশিরভাগ কম্পিউটারগুলোতে ইন্টারেক্টিভ ওয়েব পেজ, গেমস এবং ভিডিও প্রদর্শনের জন্য ফ্ল্যাশ ইনস্টল করা হয়েছে। ম্যাক্রোমিডিয়া ফ্ল্যাশ সফ্টওয়্যার পেশাগত শিল্পের বাহিরে এবং ভেতরে উভয় ক্ষেত্রে জনপ্রিয়। এই সফটওয়্যারটি আমাদের কাছে বর্তমানে অ্যাডোব ফ্ল্যাশ নামে পরিচিত।

2010 থেকে বর্তমান দিন

আজ, অ্যানিমেশন সব বয়সের জন্য সব ধরনের ওয়েবসাইট, সামাজিক মিডিয়া, টিভি এবং ফিল্ম জুড়ে নিজের উন্নয়ন সাধন করে যাচ্ছে। যদিও ফ্ল্যাশের বয়স শেষ হয়ে গেছে, কম্পিউটারের অ্যানিমেশন কৌশলগুলি তাদের সৃজনশীলতা এবং তাদের অ্যাক্সেসযোগ্যতা বৃদ্ধির কারণে সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আজ হয়তো এখানেই অ্যানিমেশনের ইতিহাস শেষ। তবে বছরের পর বছর এর উন্নতি সাধন হবে। সৃষ্টি হবে আরো নতুন নতুন ইতিহাস। প্রযুক্তির সাহচর্যে অ্যানিমেশন এগিয়ে যাবে আরো সামনে। তৈরি হবে আমাদেরকে বিনোদন দেওয়ার মতো অসংখ্য গল্প অসংখ্য চরিত্র!

Information Source:

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%85%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%A8

https://history-of-animation.webflow.io/

http://mentalfloss.com/article/17945/10-landmark-moments-animation-history

 

1,273 total views, 2 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: