একজন আশরাফুলের (মতিন) গল্প!

মতিন

আপনি “ মতিন ” নামে কাউকে চিনতেন? নামটা খুব পরিচিত মনে হয় তাইনা? হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ আমাদের আশেপাশেই অনেক “মতিনেরা” ছড়িয়ে আছে। কেউ হয়তোবা খুব কাছের আবার কেউ হয়তো বা দুরের। তবে আমি আজ এক মতিনের গল্প শোনাবো আপনাদের।

আজ যে মতিনের গল্প বলবো তার জন্ম হয় ৭ জুলাই ১৯৮৪ সালে ঢাকায়।আপনার আমার মতই এই মতিনের শৈশব জীবনও কেটেছে দুরন্তপনায় কিন্তু পাড়া ঘুরে অথবা কারো গাছের আম চুরি করে নয়। বরং ব্যাট হাতে বোলারদের শাসন করার পরে সময় হয়তো ততোটা পাওয়াও যেত না।

যার ফলশ্রুতিতে মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস ৪ দিন বয়সেই সবচেয়ে বড় কিছু অর্জন করে ফেলে এই মতিন। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে যায়গা হয়ে যায় মতিনের। এ যেন এক বিশাল পাওয়া। হ্যাঁ বাস্তবিক পক্ষেও তাই ছিল। ক্রিকেট বিশ্ব এক কিংবদন্তী হয়ত পেয়েছিলো। মতিনের উচ্চতা খুব বেশি না হওয়ায় সে লিটল মাস্টার নামেও পরিচিত হতে থাকেন, তার দৃস্টিনন্দিত ব্যাটিং সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট এবং সমগ্র ক্রিকেট বিশ্বকে এক রঙ্গিন স্বপ্নের শুরু এনে দেন এই মতিন।

স্বপ্নের শুরুটা হয় যেদিন তার টেস্ট দলে অভিষেক হয় শ্রীলংকার বিপক্ষে, সেদিন তিনি রেকর্ডের পাতা খুলেন এবং বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে নিজের নাম লিখান। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার অনেক রেকর্ড রয়েছে যা এখনোও চোখে পরার মতই বটে। নতুন কেউ কোন রেকর্ড করলেই দেখা যায় এই মতিনের নামটা সেখানে আজও রয়েছে।

শন পলক, ব্রেট লি, জহির খান, মাখায়া এনটিনি তখনকার যুগের ত্রাস সৃষ্টিকারী বোলার হিসেবে যাদের নাম, তারাও রক্ষা পান নি এই ছোট মতিনের হাতে। এই মতিনের হাত ধরেই আজকের যেই জ্বলন্ত বাংলাদেশ দেখি তার গোড়াপত্তন হয় এ বলতে আমার দ্বিধা নেই। এই মতিনই তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। যখন চায়ের দোকানের সামনে শত শত মানুষের ভিড় কাছে যেতে পারতাম না কিন্তু রিকশা দাড় করিয়ে তার উপরে ভর করে দাঁড়িয়ে যাকে দেখত তার নামই মতিন, যার দিকে তাকিয়ে থাকো গোটা বাংলাদেশ।

সবসময় মতিন পারেনি সাফল্য এনে দিতে, যা শচিন টেন্ডুলকার অথবা এবি ডি ভিলিয়ার্সের জীবনেও ঘটেছে। অথচ তারা আজ হারিয়ে যায়নি গিয়েছে মতিন, চোখের সামনে এতো কিছু দেখেও চুপ করে থাকা হোমড়া চোমড়া রা আজ চুপ। মাহমুদুল্লাহ ছয় মেরেও যখন আউট হয়ে যায় তখন কিছুই বলার থাকে না সেই হোমড়া চোমড়াদের, কারণ সে তো মাহেন্দ্র সিং ধোনি, সে তো আর “মতিন” নয়!

পাওয়া আর না পাওয়া অথবা পেয়ে হারানোর আরেক নাম মতিন। সে কোটি বাঙালীর হৃদয়ে আশা যেভাবে জাগিয়েছেন ঠিক সেভাবেই আবার নিজের হাতেই দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছেন। বার বার আশায় বুক বেধেছিল হাজার ক্রিকেট প্রেমীরা তার ব্যর্থতায়। সে তো পারে, সে তো এক সময় দাপীয়ে বেড়িয়েছিল। আবার হয়ত ফিরে আসবে। আবার হয়তো খলখলিয়ে হেসে উঠবে মতিনের ব্যাট।
এই আশায় ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও, তারা মতিনের হাতে তুলে দেয় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার ভার, যার ফলাফল আশানুরূপ না হলেও কিছুটা পরিবর্তন এনে দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাস।

২০০৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সে এই দায়িত্বে বহাল থাকেন। তার অধিনায়কত্বে থেকে বাংলাদেশ মোট ওয়ানডে খেলে ৩৮ টি, টেস্ট খেলে মোট ১৩ টি। যার মধ্যে ওয়ানডে জয় পায় মাত্র ৮ তে। কিন্তু জয়ের সংখ্যা দিয়ে যে মতিনকে পরিমাপ করা চলে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে তিন ফর্মেটেই যে দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড তার ঝুলিতে এখন পর্যন্ত।

সংখ্যার দিক দিয়ে মতিন কেমন যেন ছিলেন, কীইবা হতে পারে তার কারণ, তা জানা নেই কারোরই। তার রেকর্ডগুলো পর্যালোচনা করলেই বুঝা যাবে সংখ্যা ব্যাপারটা কতটা ভূমিকা তার ক্রিকেটীয় জীবনের। কিছুটা তুলে ধরলাম। ২০০১ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে কলোম্বো টেস্টে তিনি ১১৪ রানের ইনিংস খেলে কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ানের খাতায় নাম লিখান। এরপরে বেশ কিছু দিন তার ব্যাট হাসে নি, আবার সেই ২০০৪ সালে আবার ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় ১৯৪ বলে ১৫৮ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলেন মতিন। যেই ব্যাটিং দেখে সৌরভ গাঁগুলি বলেছিলেন তার দেখা সেরা ইনিংস!

এর পরে আসা যাক তার জীবনের সবচেয়ে বড় তথা বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় এক পাওয়ার গল্পে। ২০০৫ সালে তৎকালীন সময়ের ক্রিকেট জায়ান্টস অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক ম্যাচ জয় পায় বাংলাদেশ। তাও এই মতিনের ব্যাটে ভর করেই। ১০১ বলের ১০০ রানের এক ক্রিকেট সাহিত্য রচনায় যার সামনে দাড়াতেই পারে নি গিলেসপি, ম্যাকগ্রা, অথবা ব্রেট লির মত ক্রিকেট লেজেন্ডসরা। হতে পারে মনে আসতেই পারে যে ১০১ বলে ১০০ রান তেমন আরকি, যদি এমন প্রশ্ন আসেও তার জবাব হল, অতটুকুন বয়সে এমন বাঘা প্লেয়ারদের চোখে চোখ রেখে বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি মারা অত সোজা নয়, আর ক্রিকেট যে ব্যাট আর বলের খেলাই নয়, তা বাংলাদেশের খেলা চলার সময় হৃদপিণ্ডের বাড়তি কম্পনই জানান দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

মতিন অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের নাস্তানাবুদ করেও শান্ত হন নি, কোথায় যেন ভোঁতা কষ্ট আর প্রতিশোধের রোষানল রয়েই গিয়েছিল মতিনের মনে। তারই প্রতিফলন ঘটে পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ৫২ বলে ৯৪ রান করেন সেদিন তিনি। আজকের যুগে হলে তা কোন ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু এমন ইনিংস তখনো সোনার হরিণই বটে।

এরপরে অনেক দিন আবার ফর্মহারা হয়ে পরেন তিনি। আবার এক ভালো ইনিংসের জন্য ২০০৭ সাল পর্যন্ত সময় নেন তিনি। গায়ানায় সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপের সুপার এইট এর খেলায় মতিন তার আরও একবার সক্ষমতার প্রমাণ দেন। ৮৩ বলে ৮৭ রানের এক তান্ডবীয় এক ইনিংস! যার ফলাফল বাংলাদেশ ৬৭ রানে বিজয়ী তখনকার ১ নাম্বার র্যাং কে থাকা দলের বিপক্ষে।
এরপরে একই বছরে সুযোগ আসে টি২০ তে কিছু করে দেখানোর আর সে সুযোগই কাজে লাগান মতিন। ২০ বলে বিশ্বের দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরি করে রেকর্ড করে ফেলেন। যুবরাজ হয়তো সেই টুর্নামেন্টে ১২ বলে ৫০ করে রেকর্ড করে মতিনের রেকর্ড ভেঙে দেন কিন্তু মতিন তো নাম লিখিয়েছে তার আগে। আর এখন পর্যন্ত এই রেকর্ড অব্যাহত বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের তালিকায়! সেদিনের ইনিংসে ৭ টি চার আর ৩ টি ছক্কার বদৌলতে ২০ বলে ৫০ রান করেন তিনি।

মতিন এর ফিরে যাওয়া

পরে অনেক দিন পর্যন্ত মতিনের ব্যাট আর হাসেনি, দলে ভিড়তে থাকে সাকিব, মুশফিকের মত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের তারকারা। মতিন যেন দিন দিন গুটিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের ভিতরেই। খারাপ ফর্ম তার চলতেই থাকে আর এ যেন খুব খারাপ কিছুর আভাসই দিচ্ছিল। তা হয়তো তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন। ২০১৩ সালে তার জীবনের সবচেয়ে ভালো ইনিংস খেলেন মতিন। ক্যারিয়ার সেরা ব্যাটিং করেন তিনি, বারবার অধৈর্য হয়ে ভুল শট খেলা মতিন যেন সেদিন ধৈর্যের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। ১৯০ রানের এক অনবদ্য কাব্যিক ইনিংস ৪১৭ বলে ২০ টি চার এবং ১ ছক্কার মারে এই ইনিংস খেলেন। যাকে সবসময় ধৈর্যহারা বলে গালি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি সমালোচকরা এ যেন তাদের উদ্দেশ্যেই কি নীরব অথচ কঠিন-তম জবাব! ৪৯৯ মিনিটস তিনি ব্যাটিং করেন সেদিন।

এরপরে আরও অনেক ইতিহাস, আরও অনেক গালমন্দ আরও অনেক কিছুর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় মতিনের ক্যারিয়ার। সে গল্প নাহয় অন্য কোন একদিন করবো।

আমি আশরাফুলকে মতিন বলেই লিখাটা শেষ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু লিখার মধ্যে “মোহাম্মদ আশরাফুল” নামটা না আনলে যেন কোথায় যেন অপূর্ণতা রয়ে যাচ্ছিলো। তাই না লিখেও পারলাম না।

5,494 total views, 2 views today

3 thoughts on “একজন আশরাফুলের (মতিন) গল্প!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: