জোসেফ স্টালিন, এক স্বৈরাচারী শাসকের গল্প।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাসক হলেন হিটলার। এরপর যার নাম উচ্চারিত হয় তিনি হলেন জোসেফ স্টালিন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের এই নেতার বিভিন্ন নিষ্ঠুরতার সাক্ষী লেখা আছে ইতিহাসে। সোভিয়েত ইউনিয়নে টানা একত্রিশ বছর শাসকের আসনে আধিপত্ত বিস্তার করেন এই নেতা। দরিদ্র এক মুচির ঘরে,১৮৭৮ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জন্ম তার। তবে সাত বছর বয়সে তিনি চিকেন পক্সে আক্রান্ত হলে তা তার শরীরে স্থায়ী ভাবে ক্ষতের সৃষ্টি করে।

এরপর ১২ বছর বয়সে তার বাম হাতটি ঘোড়ার গাড়িতে দুর্ঘটনার কারনে হাড়াতে হয় তাকে। তবে লেখাপড়ায় ছাত্র হিসেবে বেশ ভাল ছিলেন তিনি। একটু বড় হবার পর তিনি সাম্রাজ্যবাদ আর ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে লেগে যান । তিনি ছিলেন রাজনিতিবিদ এবং সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক। এর কিছুদিন পর নিষিদ্ধ বই পড়ার কারনে বৃত্তি পাওয়া ছাত্র হয়েও স্কুল ছাড়তে হয় তাকে।

রাজনৈতিক জীবনের তাণ্ডব

স্কুল ছাড়ার কিছুদিন পরে লেলিনের লেখা পড়ে তিনি মার্ক্সবাদী বিপ্লবী হবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ১৯০৩ সালে লেলিনের বলশেভিকে যোগদান করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অনেক ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য গোয়েন্দা নজরদারিতে পরে যান। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন গুপ্ত প্রতিরোধ মূলক কর্মকাণ্ড এবং গুপ্ত হত্যা সহ নানা রকম অপরাধমূলক কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। ১৯০৭ সালে তিফিলস ব্যাংক ডাকাতির কারনে নানা মহলের নিন্দার মুখে পরেন। এ ডাকাতির কারনে প্রচুর মানুষ হতাহত হয় এবং তিন মিলিয়ন ডলার চুরি করার দায়ে রাজনীতিতে তার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এর মধ্যে এক সময় তিনি বিয়ে করেন এবং বিয়ের কিছুদিন পর তার প্রথম সন্তান ‘’ইয়াকভ’’ এর জন্ম হয়।

কিন্তু জন্মের কিছুদিন পর সে জর বিকারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় । তার নানা রকম অপরাধের কারনে তাকে কারা বরণ আর সোভিয়েতে নির্বাসিত হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি এতই চতুর ছিলেন যে কোন না কোন ভাবে তিনি পালিয়ে  যেতে সক্ষম হতেন।কিন্তু শেষ বার আটকের পর তাকে রুশ সেনাদলে যোগদানের জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার অচল হওয়া বাম হাতের জন্য তিনি সে দলে যোগদান করা থেকে বেচে যান। এরপর স্টালিন লেলিনের সাথে মিলে জর্জিয়া আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন।

১৯২২ সালে লেলিন স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে গেলে লেলিনের কমিটির সব ক্ষমতা স্টালিন নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেন।লেলিনকে একেবারেই বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। কিন্তু সে দলের নেতারা তার চতুরতার জন্য তাকে অপছন্দ করতো। এরপর লেলিন স্টালিনের দৃষ্ট আচরন, অভদ্রতা আর সেচ্ছাচারিতায় বিরক্ত হয়ে তাকে দল থেকে বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু স্টালিনের চতুরতার কারনে বহিস্কার তো দূরের কথা লেলিনের শেষ ইচ্ছাপত্রটিও সবার সামনে প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি। পার্টির যারাই তার বিরোধিতা করেছে বা পত্রটি সবার সামনে প্রকাশ করতে চেয়েছে তাদেরকেই বহিস্কার করে দিয়েছেন দল থেকে। এমন করেই দিনে দিনে বাড়তে থাকে স্টালিনের সেচ্ছাচারিতা। সে সাথে চলতে থাকে তার ক্ষমতার অপ প্রয়োগ যা সে তার ক্ষমতার শেষ পর্যন্ত চালিয়ে গিয়েছিল।

 

স্টালিনের হত্যাযজ্ঞ
স্টালিনের হত্যাযজ্ঞ

স্টালিনের হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন

স্টালিনের হত্যাযজ্ঞের বিবরন দিয়ে শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন একজন বেপরোয়া হত্যাকারী শাসক।

লেলিনের পার্টি প্রধান সেরগেই কিরভকে তিনি হত্যা করেছিলেন । এরপর সোভিয়েতের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিভা ও লেলিনের ঘনিষ্ঠ সহচর লিওন ট্রটসস্কিকে হত্যা করেন। ট্রটসস্কি লাল ফৌজ গঠনে অসাধারন ভুমিকা রেখেছিলেন। তিনি লেলিনের ভক্ত ছিলেন। তাই লেলিন মারা যাবার পর তার বিরদ্ধে স্টালিন বিদ্রোহের অভিযোগ আনেন ।  এভাবেই হত্যার আগে ট্রটস্কিকে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করা হয়েছিল। এরপর ১৯৩০ এর দশকে লেলিন তার ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রেখে নির্বিচারে হত্যা যজ্ঞ শুরু করেন। তিনি কম্যুনিস্ট পার্টির শত্রু সন্দেহে প্রায় কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করেন।  এছাড়াও বিভিন্ন মানুষকে কেন্দ্রিয় নিপীড়ন কেন্দ্রে নির্বাসিত করতেন।

এতকিছুর পরও তিনি সমাজে মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক, সমাজের গোড়াপত্তনকারী, জাতির পিতা ইত্যাদি খেতাবে নিজেকে সবার সামনে পেশ করতেন।  এমনকি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় তিনি জাতীয় সংগীতে নিজের নাম ঢুকিয়ে দেন। এভাবে তিনি তার মহৎ কর্ম সমাজের কাছে ফলাও ভাবে প্রচার করার জন্য কবিতা, সাহিত্তে আর নাটকে নিজের নাম ব্যাবহার করার জন্য মানুষকে বাধ্য করতেন।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল এতো ধরনের অপকর্মের পরও স্টালিন জোসেফ ১৯৪৮ সালে নোবেল পুরুস্কারের জন্য মনোনীত হন। স্টালিন জসেফ যে কতটা ভয়ঙ্কর স্বভাবের ছিলেন তা আমি তখনকার সময়ের একটি ঘটনা সরাসরি একটি লেখা থেকে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি—

‘’ উড়াল থেকে কিছু মজুরের সাথে দেখা করে আসবার পর থেকে স্টালিন তার পাইপটি খুঁজে পাচ্ছিলনা। তাই তিনি ডেকে পাঠালেন কেজীবি প্রধান লাভরেন্তি বেরিয়াকে। আর বললেন ‘’ আমার পাইপটা খুঁজে পাচ্ছিনা, গেল কোথায় সেটা ?’ বেরিয়া তাকে বললেন স্যার আপনি চিন্তা করবেন্ন, আমি আপনার পাইপ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কিছুক্ষন পর স্টালিন তার ড্রয়ারে পাইপটা খুঁজে পেলেন। তারপর পাইপে আগুন জালিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে আয়েস করে বসে ফোন করলেন বেরিয়াকে। বললেন বেরিয়া ‘’ আমি আমার পাইপটা খুঁজে পেয়েছি’’। বেরিয়া বললেন , এটা অবশ্যই আনন্দের খবর যে আপনি আপনার পাইপটা খুজে পেয়েছেন। তারপরই কপাল কুঁচকে বললেন যে, তবে যে রিমান্ডে নেয়ার পর সবাই স্বীকার করলো তারাই পাইপটা নিয়েছে  এভাবেই তাকে সবাই ভয় পেত।

জোসেফ স্টালিন এর জীবন অবসান

স্টালিনের জীবনাবসান খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না। ৭৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রথমে মস্তিস্কে রক্ত ক্ষরণের কারনে তার মৃত্যু হয়েছে বলা হয়ে থাকলেও পরে তার মৃত্যুর সাথে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের যোগসাজশের কথা বলা হয়। কিন্তু সঠিক কারন জানা যায়নি। জানা যায় স্টালিন ঘুমাতে গেলে যতক্ষণ পর্যন্ত তার ঘুম ভাঙ্গত না কেউ তাকে জাগিয়ে তোলার সাহস করত না।

তেমনিই একদিন অনেক বেলা গড়িয়ে রাত হয়ে গেলেও তিনি যখন ঘুম থেকে জাগছিলেন না, তখন একজন দেহ কর্মী সাহস করে তাকে ডাকতে গিয়ে দেখেন যে তিনি নিজের মূত্র নিজের গায়ে মেখে জুবুথুবু হয়ে পরে আছেন। দেহে প্রান ছিল কিন্তু বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এভাবেই অসুস্থ থেকে কিছুদিন পর অত্যাচারী এ শাসক মৃত্যু বরন করেন।

 

তথ্য সূত্রঃ

http://www.somewhereinblog.net/blog/sherzatapon/29954825

https://en.wikipedia.org/wiki/Joseph_Stalin

1,121 total views, 6 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: