বাংলাদেশ ক্রিকেট এবং এর ইতিহাস (History of Bangladesh Cricket)

নিশ্চিত পরাজয় থেকে ধমনী ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া উত্তেজনার বহিঃ-প্রকাশ আমার মনে হয় কেবল ক্রিকেট খেলায়ই সম্ভব। অন্তত আমাদের মত ক্রিকেট প্রেমী জাতির কাছে। এই খেলাটা কবে যেন খেলা থেকে নিজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়ে গেছে তা নিজেই জানিনা।ওদের সাথে চোখের পানি ফেলেছি সে তো আর সংখ্যায় কম না। উইকেট যাওয়ার সাথে সাথে রাগ করে টিভি বন্ধ করে উঠে গেছি তার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তবে কিসের টানে আবার ফিরে এসে আবার বসেছি তার সংখ্যা কোন অংশেই কম ছিল না এটা বলতে পারি। এভাবেই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ক্রিকেট আমাদের চেতনায়, আমাদের ধমনীতে।

আচ্ছা, খেলাধুলা আমি জানি শরীর চর্চার একটা অংশ অথবা শখের বশেও অনেকে খেলা দেখেন এবং খেলেন কিন্তু কেউ কি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন? কবে কিভাবে এ আমাদের রক্তে রক্তে মিশে গেছে? রক্তে মিশে গেছে বললাম কারণ যখন খেলার কোন উত্তেজনাপূর্ণ অংশ চলে আসে, মাথার দুপাশের ধমনীতে কেমন এক্সট্রা প্রেশার ফিল করি। অন্য কারো মানুষের কথা আমি বলছি না।

অনেক বার লাল সবুজ ঘেরা ছেলে গুলো কে ছলছল চোখে মাঠ ছাড়তে দেখেছি। ওদের সাথে সাথে নিজের গলার কাছে কি যেন এসে বিঁধত, হঠাৎ করে ঝাপসাও হয়ে যেত। জানিনা কিভাবে হল, জানিনা কিভাবে এতোটা অত:প্রত ভাবে জড়িয়ে গেছি ওদের সাথে। কখনো ওদের হাসিতে মহল্লা জুড়ে মিছিলে নেমেছি, কখনো ওদের উপরে হিমালয় সম অভিমান করেছি, কিন্তু কখনো ছেড়ে যেতে পারিনি।

স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ক্রিকেট খেলা আয়োজন করা শুরু হয় ১৯৭২ সালে। তখন ই “বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড” প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পুর্নাঙ্গ সদস্য পদ লাভ করার পর এই নাম পরিবর্তন করে “বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড” (বি.সি.বি) রাখা হয়। এরপর ১৯৭৪-৭৫ সাল থেকে শুরু হয় বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা।

১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ গাজি আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথম ও.ডি.আই ম্যাচ খেলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। সেই ম্যাচে কেবল ৯৪ রানে গুটিয়ে গেলে ও সেই থেকেই পথ চলা শুরু হয় টাইগার দের। তারপর ১৯৯৭ সালে প্রথম আই.সি.সি ট্রফি জয়ের মাধ্যমে ক্রিকেট বিশ্বে প্রথম হুংকার দেয় টাইগার বাহিনী।

বাংলাদেশ প্রথমবারের মত ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে ১৯৯৯ সালে। প্রথম আসরেই বাজিমাত করে পাকিস্তানকে হারিয়ে। যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরা প্রথম ও.ডি.আই হেরেছিলাম সেই পাকিস্তান কে হারিয়েই বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। সেই বিশ্বকাপে আরো একটি জয় তুলে নিয়েছিলো টাইগাররা। সেটি ছিল স্কটল্যান্ড এর বিপক্ষে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট
Image Source: todaysangbad.com

টেষ্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশঃ

২৬ জুন ২০০০ সালে আই.সি.সির দশম টেস্ট খেলুড়ে দল হিসেবে টেস্ট ক্রিকেট বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রথম টেস্ট খেলে ভারতের বিপক্ষে। এর মাঝেই দেখতে দেখতে কেটে গেলো প্রায় ১৮ টি বছর। এই ১৮ বছরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সর্বমোট ১০৬ টি টেস্ট খেলেছে। এর মধ্যে জিতেছে ১০ টি হেরেছে ৮০ টি এবং ড্র করেছে ১৫ টি টেস্ট ম্যাচ। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় টি এসেছিলো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০৫ সালে। প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়টি ও এসেছিলো তখনই। দুই ম্যাচ সিরিজে জিম্বাবুয়েকে ১-০ তে হারিয়েছিলো টাইগার রা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তাদের শততম টেস্ট ম্যাচ টি খেলেছিল অভিষেকের ১৬ বছর ৪ মাস ৬ দিন পর, স্বাগতিক শ্রীলংকার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ৪ উইকেটের জয় তুলে নিয়েছিলো বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ৬৩৮ রান এবং সর্বনিম্ন স্কোর ৬২ রান। দুটিই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংস এ সর্বোচ্চ ২১৭ রান করেছেন সাকিব আল হাসান। এছাড়া সর্বোচ্চ ১৮৮ টি উইকেট শিকার করে উইকেট শিকারিদের তালিকায় ও প্রথম স্থান দখল করে আছেন সাকিব আল হাসান। একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে “হোম অফ ক্রিকেট” খ্যাত লর্ডসে সেঞ্চুরি করেন তালিম ইকবাল। তাছাড়া বাংলাদেশের হয়ে স্বচ্ছ (৩৮৩৫) রানের রেকর্ডটি ও তালিম ইকবালের দখলে। সর্বশেষ আইসিসির র‍্যাংকিং অনুযায়ী ৭১ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে লিস্ট এর ৯ নাম্বারে আছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশঃ
Image Source: ntvbd.com

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশঃ

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ১৯৮৬ সাল থেকে ওয়ানডে ক্রিকেটে পথচলা শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত খেলেছে মোট ৩৪০ টি ম্যাচ। এর মাঝে জয় রয়েছে ১০৮ টিতে এবং হেরেছে ২২৫ টি ম্যাচ। সর্বমোট ৫ টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছে লাল সবুজের বাংলাদেশ। এর মাঝে সর্বোচ্চ অর্জন ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানো। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহ ৩২৯ রান, ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং সর্বনিম্ন সংগ্রহ ৫৮ রান, ২০১১ সালে ওয়েস্টই ইন্ডিজ এর বিপক্ষে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩২২ রান তাড়া করে জিতে স্কটল্যান্ড এর বিপক্ষে। একদিনের ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৫৪ রানের ইনিংস খেলেন তামিম ইকবাল। সব থেকে বেশি রান (৫৯৩৪) রেকর্ডটি ও তার দখলে।অন্যদিকে সর্বোচ্চ ২৩৪ টি উইকেট নেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ২৩২ টি উইকেট নিয়ে তার পরেই আছেন সাকিব আল হাসান।  এক ম্যাচে ২৬ রানের বিনিময়ে ৬ টি উইকেট নিয়ে একদিনের ক্রিকেটে বেস্ট বোলিং ফিগারের রেকর্ডটি রয়েছে যৌথভাবে মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং রুবেলের দখলে। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪ বার ৫ উইকেট নিয়েছে আব্দুর রাজ্জাক। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ৯ টি সেঞ্চুরি করেছেন তামিম ইকবাল। সর্বশেষ আইসিসির র‍্যাংকিং এ ৯০ পয়েন্ট নিয়ে ৭ম স্থানে আছে বাংলাদেশ।

টি টুয়েন্টিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট
Image Source: jagonews24.com

টি টুয়েন্টিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট :

২০০৬ সালে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম টি টুয়েন্টি ম্যাচ খেলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এখন পর্যন্ত সর্বমোট ৭৬ টি টি টুয়েন্টি ম্যাচ খেলে “দ্যা টাইগার” খ্যাত দলটি। এর মাঝে ২৩ টিতে জয় এবং পরাজয় রয়েছে ৫১ টি ম্যাচে। ৬ টি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলে ও সর্বোচ্চ দ্বিতীয় রাউন্ড (২০০৭,২০১৪,২০১৬) পর্যন্ত পৌছাতে সক্ষম হয় তারা। টি টুয়েন্টি তে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহ ২১৫ রান। নীদাহাস ট্রাই নেশন সিরিজে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ২১৫ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ১৯ ওভার ৪ বলে ৫ উইকেট হাতে থাকতেই ২১৫ রান তুলে নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। টি টুয়েন্টি তে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান চেজ ও এটিই। এছাড়া ২০১০ এ নিউজিল্যান্ড এর বিপক্ষে সর্বনিম্ন ৭৮ রানে অল আউট হয় টিম বাংলাদেশ। টি টুয়েন্টি তে বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র সেঞ্চুরি করার রেকর্ড আছে শুধুমাত্র তামিম ইকবাল খান এর। এছাড়া এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের হয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০৯২ রান করে রান সংগ্রহের তালিকায় সবার উপরে আছেন তামিম এবং সর্বোচ্চ ৭৫ টি উইকেট নেন সাকিব আল হাসান।১৩ রানের বিনিময়ে ৫ টি উইকেট নিয়ে এক ইনিংসে বেস্ট বোলিং ফিগার এর রেকর্ডটি ইলিয়াস সানির দখলে। সর্বশেষ আইসিসির র‍্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ ৭৭ পয়েন্ট নিয়ে আছে ১০ নাম্বারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রতি এখন চাওয়াটা এখন প্রায় আকাশচূম্বি হয়ে গেছে। অনেক ভাঙা গড়ার মধ্যেও তাদের পাশে দাড়াতে একবিন্দু পরিমাণও কুন্ঠাবোধ হয়না। আরে যতদিন বাচবো হবেও না হয়তো। আগেই বলেছি স্পোর্টস সেকশন ছেড়ে ক্রিকেটটা অনেক আগেই ধমনীতে জুড়ে গেছে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কোটি প্রানের সাথে মিশে থাকবে চিরকাল। ১০ উইকেটের বিজয় হোক আর ১০ উইকেটের বিশাল পরাজয়ই হোক, ভালোবাসাটা কোনদিনও কমবে না এতটুকু শিউর দিয়ে বলে দিতে পারি।

3,022 total views, 9 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: