ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিগ ব্যাং (মহা বিস্ফোরণ তত্ত্ব) / বিগ ব্যাং এবং ইসলাম

বিগ ব্যাং

মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব হল একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বঃ

এই তত্ত্ব মতে মহাবিশ্ব কোন ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি। বরং একটি বিশেষ মুহূর্তে মহাবিশ্ব এর উদ্ভব হয়েছে। এই তত্ত্ব বলা হয় যে এখন থেকে প্রায় ১৩.৭৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি ঘন আর উত্তপ্ত অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি। ১৯২৭ সালে জর্জ লামিত্রে নামে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলেন যে, মহাবিশ্ব একটি একক পয়েন্ট থেকে সৃষ্টি। মহাবিশ্ব বিশাল এবং এর বিস্তৃতি ঘটেই চলছে। লামিত্রই সর্বপ্রথম স্বাধীন ভাবে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এর ক্ষেত্র সমীকরণ থেকে ফ্রিদ্মান সমীকরণ উৎপাদন করেন। লামেত্র প্রস্তাব করেন যে মহাবিশ্ব একটি সুপ্রাচীন পরমাণু থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। আর এ প্রস্তাবটিই এখন মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব নামে পরিচিত। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এর মতে “ দূরবর্তী ছায়া পথ সমূহের বেগ সামগ্রিক ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এরা পরস্পর দুরে সরে যাচ্ছে অর্থাৎ মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে ’’।

মহা বিস্ফোরণ তত্ত্বের ইতিহাস:

মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গঠন এবং এর তত্ত্বের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা থেকেই মহা বিস্ফোরণ তত্ত্বের উদ্ভব। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলেন যে মহাকাশের ছায়াপথ গুলো ক্রমশ আমাদের থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। আমরা মহাকাশে যে, গ্রহ, ধূমকেতু, গ্রহাণু,নক্ষত্র দেখতে পাই এগুলো আগে এই জায়গায় ছিল না। কোথা থেকে এসেছে এগুলো ? এমন ধরনের প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়েছে মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের। এডউইন হাবল এর তত্ত্ব মতে, পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান ছায়াপথ সমূহ থেকে নিঃসৃত আলোর লোহিত অপসারণ হচ্ছে এবং এই অপসারণ পৃথিবী থেকে তাদের দূরুত্ত্বের সমানুপাতিক। এর অর্থ হল একটি ছায়াপথ পৃথিবী থেকে যত দূরে সরে যাবে, তা থেকে বের হওয়া আলোর বর্ণালি তেমনি লাল। যা দীর্ঘ তরঙ্গ  দৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে। হাবল প্রমাণ করতে পেরে ছিলেন যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। পরে, ফ্রেড হয়েল নামে একজন ১৯৪৯ সালের ২৮শে মার্চ বিবিসি তে প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে লামেত্রের এই তত্ত্বকে ‘’ বিগ ব্যাং’’ বলে উপস্থাপন করেন। এরপর থেকেই এই তত্ত্ব বিগ ব্যাং তত্ত্ব নামে পরিচিত হয়ে আসছে।

 

বিগ ব্যাং
ইসলাম এবং বিগ ব্যাং- Image Source- islamandlife.org

ইসলাম এবং বিগ ব্যাং:

কুরআনে আর বলা হয়েছে, ‘’যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের মনে করো না যে, আসমান ও জমিন একদল ছিল এবং আমরা তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি এবং প্রত্যেক জীবিকারাই পানি থেকে সৃষ্টি করেছি?  তাহলে তারা কি বিশ্বাস করবে না?’’- আয়াত২১;৩০। আহমাদিয়া মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রধান মির্জা তাহেরি তার বই প্রকাশনায় যুক্তিবিজ্ঞান, জ্ঞান ও সত্যের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, বিগ ব্যাং এর কথা কুরআনে বলা হয়েছে। তিনিও সুরা আম্বিয়া এর ৩০ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেছেন। বিগ ব্যাংকে প্রাথমিকভাবে আরও অনেক মুসলিম পণ্ডিতও স্বীকৃতি দিয়েছেন। এছাড়াও ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল এর ফাহিম আশরাফ এবং ইসলামি গবেষণার সুলেমান অফ ইয়াকিনের শেখ অমর বলেন যে, প্রসারিত মহাবিশ্বের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি সূরা আত-ধারিয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

‘’ আর আকাশকে আমি শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছি, আর আমরা অবশ্যই এর বিস্তারকারী।‘’- কুরআন। আয়াত- ৫১;৪৭
তাহলে বলা যায়, কিছু কাল আগে থেকে বিজ্ঞানীরা যে বিস্ফোরণ তত্ত্বের আলোচনা ও গবেষণা শুরু করেছেন সে বিষয়ে হাজার হাজার বছর আগেই কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পৃথিবীর গঠনঃ

বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের তত্ত্বকে ব্যাবহার করে এ উপসংহারে এসেছিলেন যে, মহাবিশ্ব প্রকৃতপক্ষে আবির্ভূত হয়েছে একক, অবিশ্বাস্য ছোট, ঘন এবং গরম অঞ্চল থেকে। যে গরম অঞ্চলটি বিগ ব্যাং নামে পরিচিত। ১৯৪৮ সালে জর্জ গেমউ মহাবিশ্বের তত্ত্বে কিছুটা সংশোধন করেন। সেখানে বলা হয়েছে, বিগ ব্যাং একটি বিস্ফোরণ।যা থেকে পৃথিবীর সৃষ্টি। হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম হল বিগ ব্যাং এর প্রাথমিক উপাদান।  যা ১০ থেকে ১৫ বছর আগে একটি অত্যন্ত ছোট, গরম, ঘন  ধারনা থেকে শুরু হয়। এরপর থেকে এর বিস্তৃত গঠন, প্রসারণ থেকে আজকের এ পৃথিবীর সৃষ্টি।

বিগ ব্যাং এর প্রমাণ:

বিগ ব্যাং মডেল প্রচলিত বা কোয়ান্টাম জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে  গ্রহণ করা হোক বা না হোক, এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত যে, আমাদের মহাবিশ্ব একক, অস্পষ্ট, ক্ষুদ্র, ঘন এবং গরম উৎস থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী বলা যায় ১৫০০ কোটি বছরেরও আগে মহাকাশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুগুলো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এরপর এ সব বিক্ষিপ্ত অণু গুলো আন্তঃ আকর্ষণের কারণে একে অপরের কাছাকাছি আসতে থাকে এবং বড় একটা ডিমের আকার ধারণ করে। কোয়ান্টাম সূত্রানুসারে বিগ ব্যাং ১০-৪৩ সেকেন্ডের ভিতর ৪ টি প্রাকৃতিক বলের সমন্বয় করে ছিল। এরপর এ ৪ টি বল মিলিত হয়েই একটি বৃহৎ বলের সৃষ্টি হয়।

অন্যান্য ধর্মে বিগ ব্যাং এর ব্যাখ্যা;

হিন্দু পুরাণ অনুসারে বলা হয়েছে যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টি তত্ত্ব কোন সময় শুরু হয়েছে তার কোন সঠিক সময় জানা নেই। কিন্তু মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব মানবতাকে মনে করিয়ে দেয় যে সব কিছু ব্রহ্ম থেকে এসেছে। নাসাদিয়া সুক্তা রচনায় বলা হয়েছে, পৃথিবী তাপ শক্তির মাধ্যমে একটি বিন্দু থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটিও বিগ ব্যাং তত্ত্বের সাথে মিলে যায়।

খ্রিস্টান ধর্মেও বিগ ব্যাং তত্ত্বকে স্বাগত জানানো হয়েছে। ১৯৫১ সালের ২২ নভেম্বর পোপ পিউস পলিফিকাল একাডেমীর উদ্বোধনী সভায় ঘোষণা করেন যে বিগ ব্যাং খ্রিস্টান ধর্মের সাথে বিরোধিতা করে না। শুধু কিছু রক্ষণশীল ক্যাথলিক ছাড়া সবাই বিগ ব্যাং তত্ত্বের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। বাইবেলেও এ তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে।

ইতিকথাঃ

বিজ্ঞানীরা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব নিয়ে নানা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কোয়ান্টাম জ্যোতির্বিদ্যায় এ কথা প্রতিষ্ঠিত যে আমাদের মহাবিশ্ব একটি ক্ষুদ্র, একক, ঘন ও গরম উৎস থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ কথার সাথে কুরআনের বর্ণনা পুরপুরি মিলে যায়। এটি সবচেয়ে ভাবার বিসয় যে জখন মানুষ এ সত্যটি সম্পর্কে ঘুনাক্ষরেও ধারনা করতে পারেনি বা সামান্যতম জ্ঞান প্রকাশ করেনি,  তার অনেক আগে থেকেই এর ব্যাখ্যা পবিত্র কুরআনে পাওয়া গিয়েছে। তবে এই তত্ত্বের অস্পষ্টতাকে ভবিষ্যতে স্পষ্ট করতে হতে পারে। কারণ বিজ্ঞান কোন অনুমান নির্ভর তথ্য মানতে চায় না। যেহেতু মানুষের জ্ঞান সীমিত তাই এই তত্ত্বর বাইরেও আর অনেক কিছু থাকতে পারে। হয়ত বিজ্ঞানীরাও সেই অজানাকেও একসময় আমাদের সামনে তুলে ধরতে পারবে।

Information source;  https://spaceplace.nasa.gov/big-bang/en/
https://en.wikipedia.org/wiki/Religious_interpretations_of_the_Big_Bang_theory
https://en.wikipedia.org/wiki/Big_Bang
image source; https://www.google.com/search?q=image+of+big+bang&tbm=isch&source=iu&ictx=1&fir=uA8YMkvFA3zphM%253A%252C1dGAVj8jpS7OiM%252C_&usg=__V24olP0KpT

4,273 total views, 3 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: