এক কিংবদন্তী নারী- লেডি গোডিভা

 লেডি গোডিভা

আমরা যুগে যুগে অনেক মহীয়সী নারীর কথা শুনেছি। তাঁদের ত্যাগ, অবদান, মননশীলতা আর উদারতার কারণে তাঁরা অন্য সাধারণ নারীর থেকে আলাদা আর অনন্য। আর হয়েছেন মহীয়সী। তাদের সবার কথা হয়ত আমাদের জানা নেই। কিন্তু অনন্য সেই নারীদের কথা আমাদের জানতে হবে। তাদের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে। তাঁদের অমর কর্ম থেকে আমাদেরও শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং তা কাজে লাগাতে হবে। তাই আজ আমি সেইরকমই একজন কিংবদন্তীর গল্প আপনাদের সামনে তুলে ধরবো, যার নাম লেডি গোডিভা ।

লেডি গোদিভার বিখ্যাত হও্য়ার পিছনে রয়েছে অনেক জল্পনা কল্পনা। আজ আমরা সেই বিষয় গুলোই জানার চেস্টা করবো।

কে ছিলেন এই লেডি গোডিভা?

লেডি গোডিভা ছিলেন ইংল্যান্ডের কোভেন্ট্রি শহরের লর্ড  আর্ল লিফ্রিকের স্ত্রী। তিনি একজন সুশ্রী,  ধর্মপরায়ণ, সহানুভূতিশীল আর উদার মনের মানুষ ছিলেন। অপরদিকে  লর্ড লিফ্রিক ছিলেন বিচক্ষণ আর বুদ্ধিমান। কিন্তু লিফ্রিক তার প্রজাদের কাছ থেকে খুব বেশি ট্যাক্স নিতেন। যার কারণে প্রজারা খুব কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করতো । গরিব প্রজারা  লিফ্রিকের এই অত্যধিক করারোপের কারণে তার প্রতি খুব বিরক্ত ছিলেন। অন্য দিকে লেডি গোডিভা ছিলেন সংস্কৃতি-মনা । তিনি চাইতেন প্রজারা গান গাইবে, ছবি আঁকবে এবং নাচ করবে। প্রজাদের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ। কিন্তু যেখানে সাধারণ জনগণের লিফ্রিকের ট্যাক্স দিতেই খুব কষ্ট হতো, অনেক কষ্টে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হতো সেখানে কোন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা তাদের কাছে ছিল দিবা স্বপ্নের মতো। গোডিভা এ সব কিছু সম্পর্কে খুব ভাল ভাবে অবগত ছিলেন। প্রজাদের জন্য তার হৃদয় কাঁদত । এজন্য তিনি বহুবার তার স্বামীকে অনুরোধ করেন প্রজাদের কর কমিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু লিফ্রিক তার এ অনুরোধ রাখেন নি।  কারণ প্রজারা যদি কর না দেয় তাহলে তার রাজ্যের প্রশাসনিক খরচ কে মিটাবে?

গোডিভার নানা কাকুতি মিনতির পর একদিন লিফ্রিকের মনে দয়া হল। তিনি গোডিভাকে বললেন এক শর্তে তিনি প্রজাদের কর কমিয়ে দিবেন । আর শর্ত হল, গোডিভাকে নগ্ন হয়ে পুরো রাজ্যের রাস্তায় ঘোড়া দিয়ে ঘুরতে হবে। তার এ কথা শুনে গোডিভা প্রচণ্ড আহত হলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ নারী এবং এক সন্তানের মা। সেখানে কিভাবে তিনি নগ্ন হয়ে সবার সামনে ঘুরে বেড়াবেন? তিনি প্রথমে অস্বীকৃতি জানান যে তিনি কিছুতেই তার লজ্জা আর সম্ভ্রম এভাবে নষ্ট করতে পারবেননা। তখন লিফ্রিক বললেন, তুমি তো অনেক লম্বা চুলের অধিকারী। তুমি চাইলে তোমার লজ্জা-স্থান তোমার দীর্ঘ চুল দিয়ে ঢেকে রাখতে পারো। আর মজা করে বললেন,গ্রিকরা তো নগ্নতাকে ঈশ্বর আর সুন্দরের পূজা করতো।

লেডি গোডিভা স্মৃতিস্তম্ভ
লেডি গোডিভা স্মৃতিস্তম্ভ- Image Source: Wikimedia

তার এই উক্তিকে স্মরণ করে এক গীতিকার লিখেছিলেন,

‘’Her long blonde hair

Falling down across her arms

Hiding all the lady’s charms’’

লিফ্রিক তাকে আরও আশ্বস্ত করেন যে, যে সময় গোডিভা নগ্ন অবস্থায় ঘোড়ায় আরোহণ করবে সে সময় তিনি প্রজাদের  ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করবেন।  কেউ যদি বের হয় তাহলে তাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু তারপরও অনেক চিন্তা ভাবনা আর প্রজাদের  কষ্টের কথা বিবেচনা করে গোডিভা রাজী হন লিফ্রিকের কঠিন শর্তে। কথামত লিফ্রিক পুরো শহরে ঘোষণা দিয়ে দেন যে আজ তার স্ত্রী পুরো শহরে ঘোড়ায় আরোহণ করবে তাই সবাই যেন দরজা জানালা বন্ধ করে রাখে। বিনিময়ে তাদের কর মাফ করা হবে। প্রজারাও এ কাজে সম্মত হন। কারণ গোডাইভা যদি তাদের জন্য এত বড় আত্মত্যাগ করতে পারে তাহলে তারা পারবেনা কেন? তারা দরজা জানালা বন্ধ করে গোডিভার জন্য প্রার্থনা করা শুরু করলেন। গোডিভা সারা রাত পুরো শহরে ঘোড়ায় চড়ে বেড়ালেন। কিন্তু কেউ তার নগ্নতা দেখার জন্য বের হল না।

নগ্ন অবস্থায় গোডিভা ঘোড়ায় আহরণ করার পর লিফ্রিক তার শর্তানুযায়ী প্রজাদের কর মওকুফ করে দেন। লেডি গোডিভার সময়কাল ছিল (১০১০-১০৬৭)পর্যন্ত। তারপর তার কাহিনী ১৩ শতাব্দী থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে পরে।

লেডি গোডিভা
লেডি গোডিভা- Imagce Source: www.rsi.ch

কিছু অজানা আর বিভ্রান্তিকর তথ্যঃ

এরপর একদিন গোডিভার মৃত্যুর অনেক পর তাঁর কাহিনী সর্বত্র ছড়িয়ে যেতে থাকে। এবং তাকে কিংবদন্তী বলে আখ্যা দেয়া হয়। বিভিন্ন লেখক সে সময় সে কাহিনীটিকে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ করে। কেউ কেউ রাজনৈতিক পক্ষপাত দুষ্ট হয়ে লিফ্রিকের সম্পর্কে নানা কাহিনী ছড়াতে থাকে। জানা যায়, সে সময় লিফ্রিকের  বিরদ্ধে যে অতিরিক্ত কর আরোপের কথা শুনা যায় তা নাকি মিথ্যে। কারণ সে সময় শুধু ঘোড়া ছাড়া আর অন্য কিছুর উপর কর আরোপ করা হত না। আর গরিব জনগণের ঘোড়া থাকার কথা নয়। তাই তথ্যটি সম্পূর্ণ সত্যি নয়। লেডি গোডিভার কাহিনীটি আজ থেকে ৯০০ বছর পূর্বে ঘটে। এরপর থেকে ঘটনাটি বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন জনের কাছে শুনা যায়। কভান্ট্রি শহরে প্রতিবছর গোডিভার স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়। লেডি গোডিভার নগ্ন চিত্র নিয়ে কভান্ট্রি শহরে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। প্রতি বছর বিভিন্ন পর্যটক এ ভাস্কর্য দেখতে আসে। বলা হয়ে থাকে  এ বিষয়টিকে সে শহরের বাসিন্দারা বাণিজ্যের দিক থেকে লাভবান হবার জন্য ডালপালা বাড়িয়ে কাহিনী রচিত করছেন।অনেকে আবার ঘোড়ায় নগ্ন হয়ে চড়ার বিষয়টি পুরোই বানোয়াট বলেছেন। তাই ইংল্যান্ডের একজন সাংবাদিক এ বিষয়ে লিখেছেন এভাবে-

“The story of lady godiva riding through the streets naked sadly does not ring true.”

আসলে বিষয়টি কত টুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

লেডি গদিভাকে নিয়ে শুধু ভাস্কর্যই তৈরি হয়নি। তার কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে বহু ফিল্ম, গল্প, গান আর কবিতাও। তাই বলা যায় বিষয়টি যদি মিথ্যাই হয়ে থাকে তাহলে এটি এত ব্যাপক ভাবে ছড়ানোর কথা নয়। অবশ্যই এর মধ্যে কিছু সত্যতা রয়েছে।

ইতিকথা:

সম্ভবত গোডিভার জন্ম হয় ১০০০ সালেরও আর পরে। তার জন্ম সাল সঠিকভাবে জানা যায় নি। তার স্বামী মারা যাবার পর তিনি তার স্বামীর বিপুল সম্পদের মালিক হন। তারপর ১০৮৬ সালে তিনি মারা যান। তিনি মারা যাবার পর স্বামীর পাশেই তাকে সমাধিত করা হয়। লেডি গোডিভার কাহিনী অনুযায়ী তিনি ছিলেন ত্যাগ আর ভালবাসার উজ্জ্বল উদাহরণ। তাই তার কথা ইতিহাসের পাতায় লিখা থাকবে।

Information source:

http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29710719

https://en.wikipedia.org/wiki/c

Image source; http://www.somewhereinblog.net/blo

https://en.wikipedia.org/wiki/

3,558 total views, 6 views today

One thought on “এক কিংবদন্তী নারী- লেডি গোডিভা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: