সিজোফ্রেনিয়া এবং ইসলাম

Schizophrenia

সিজোফ্রেনিয়া

সিজোফ্রেনিয়া হল এক ধরনের রোগ। যে রোগের ফলে রোগী বিভিন্ন অসংলগ্ন বা উদ্ভট আচরণ করে। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগীদের সবার আচরণ একরকম নয়।  এরা এক এক জন এক এক ধরনের আচরণ করতে পারে। কারো কারো চিন্তা ধারার সাথে বাস্তব কাজ কর্মের কোন মিল থাকেনা। আর কেউ কেউ সম্পূর্ণ বাস্তব বিমুখ হয়ে পরে। বেশিরভাগ সময়ে তারা হেলিসিউশনে ভুগে। পুরো বিশ্বে প্রায় ০.৩ থেকে ০.৭% মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে অনেক সময় রোগীর পরিবারের লোকেরা এ রোগ কে রোগীর আলাদা এক ধরনের বৈশিষ্ট্য বা আধ্যাত্মিক শক্তি বলে ধরে নেয়। তারা রোগীকে জিনিয়াস মনে করতেই পছন্দ করে।তবে এদের বেশির ভাগ রোগীই বুদ্ধিমান এবং সংবেদনশীল।

রোগের লক্ষণ বা ধরন

আগেই বলেছি যে, এ রোগে সব রোগী একই আচরণ করেনা। তবে যে আচরণ গুলো বেশি দেখা যায় সেগুলো হল,

১/ অদ্ভুত বা অসংলগ্ন আচরণ করা।

২/বাস্তব বিমুখ আচরণ করা। বাস্তব জীবনের প্রায় সব ধরনের কাজকর্ম থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।

৩/হেলিসিউসনে ভুগা বা এলোমেলো চিন্তা করা।

৪/ এলোমেলো চিন্তা গুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়া।

 

সিজোফ্রেনিয়া
সিজোফ্রেনিয়া -Image Source: medicalnewsbulletin.com

 

বিজ্ঞানে সিজোফ্রেনিয়ার ব্যাখ্যা

আধুনিক বিজ্ঞানের প্রদত্ত নামই হল সিজোফ্রেনিয়া। বিজ্ঞানীদের মতে সিজোফ্রেনিয়া অনেক সময় বংশ পরম্পরায়ও হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, শরীরে থাকা বিভিন্ন জিন এর সমন্বয়ের দ্বারা এ রোগের সৃষ্টি হয়। কোন একক জিন এ জন্য দায়ী নয়। তাই কিভাবে সিজোফ্রেনিয়ার বিকাশ হবে এ বিষয়ে কোন জেনেটিক তথ্য ব্যাবহার করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন সিজোফ্রেনিয়ার বিকাশের জন্য ব্যাকটেরিয়া আর জিনের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রয়োজন হয়। এছাড়াও কিছু পরিবেশগত কারণে সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। কারণ গুলো হল, জন্মের আগে অপুষ্টি, জন্মের সময় সমস্যা এবং কিছু মনোবিজ্ঞানীক কারণে। কিছু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জন্মের আগে মস্তিষ্কের ত্রুটিপূর্ণ বিকাশের কারণে এ রোগ হতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কে বিশাল পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তন গুলো জেনেটিক্স বা মস্তিষ্কের পার্থক্যের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণ হিসাবে দেখা যায়।

চিকিৎসা এবং থেরাপি

সিজোফ্রেনিয়ার সঠিক কারণ এখনও অজানা। তারপরও এ রোগের চিকিৎসা রয়েছে। যেমন,

এন্টিসাইকোটিক প্রক্রিয়া

এন্টিসাইকটিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকদিন তরল বা পিল সেবন করতে হয়। কিছু এন্টিসাইকোটিক ইনজেকশন আছে যা মাসে এক বা দুইবার দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রথম দিকে কিছু দৈহিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিন্তু তা কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে যায়।

সমন্বিত বিশেষ যত্ন

এটি একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা যার ফলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। এ চিকিৎসায় ওষুধ, মনোবিজ্ঞানীর থেরাপি, কেস ম্যানেজমেন্ট, পরিবার এবং বন্ধু বান্ধব সব এক যোগে রোগীকে সুস্থ করার জন্য চেষ্টা চালায়। এ পদ্ধতিতে রোগীর মানুষিক অবস্থার উন্নয়নে এবং স্বাধীন জীবন পরিচালনা করতে সাহায্য করে।

 

সিজোফ্রেনিয়া
সিজোফ্রেনিয়া এন্ড ইসলাম- Image Source: dawn.com

 

ইসলামে সিজোফ্রেনিয়া

সত্যিকার অর্থে ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয় এখানে রয়েছে সারা জীবনের একটি সম্পূর্ণ কোড । এখানে সম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা দেয়া আছে।ইসলামেও এ রোগ সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া আছে এবং এর চিকিৎসাও রয়েছে। মূলত এ রোগ বিভিন্ন মানুষিক আর শারীরিক কারণে হতে পারে। তবে ইসলামে বলা হয় যে, যখন পৃথিবীতে পাপের পরিমাণ বেড়ে যাবে , মানুষের ঈমান থাকবেনা এবং একজন আরেকজনকে খুন করবে তখন এ রোগের পরিমাণ বেড়ে যাবে। বিভিন্ন ধরনের কাল জাদু টোনা দ্বারা যে কোন লোক এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

ইসলামে বলা হয়েছে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সময়কাল হতেই এ রোগের রোগী দেখা গিয়েছে। এমনকি নবী মুহাম্মদকেও জাদু টোনা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি পবিত্র কুরআনের দেয়া নিয়ম মেনে এ রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেন। নবীজি বলেছেন “’ আল্লাহ যখন রোগ সৃষ্টি করেছেন তখন তিনি তার প্রতিকার করেছেন’’। কেউ যদি ঈমান এনে নিয়মিত কুরআন পাঠ করে, আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন,তাহলে যেকোনো রোগের প্রতিকারই সম্ভব।সৌদি আধ্যাত্মিক ও ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আব্বাস আরব নিউজকে বলেন যে ‘’ বেশিরভাগ মানুষ কালো জাদু বা চক্ষু চক্রের প্রভাবের ফলে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়। তিনি বলেন যে, এ ধরনের রোগ সাধারণত পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক চাপ এবং টানা পোড়নের ফলে হয়ে থাকে। বিকল্প ভাবে তা কাল-জাদু দ্বারা হয়ে থাকে। একজন ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি পবিত্র কুরআনে এ রোগের যে নিরাময় পদ্ধতি আছে তিনি সে অনুসারে চিকিৎসা করে থাকেন।

ইসলামে সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা

এ রোগে রোগী যদি অতিমাত্রায় অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে সে মোতাবেক উপযুক্ত চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা করা বাঞ্ছনীয়। তবে ইসলামেও এ রোগের চিকিৎসা রয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামি চিকিৎসা গ্রহণ করে আর নিয়ম অনুসরণ করে অনেক মানুষ আরোগ্য লাভ করেছেন। নিচে নিয়মগুলো দেয়া হল,

১/ দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। কিন্তু একজন সিজফ্রেনিয়ান রোগীর ক্ষেত্রে দিনে পাঁচবার নামাজ আদায় করা সম্ভব নয়। তাই অন্তত একবার হলেও পড়তে হবে। এতে তার ঈমান বাড়বে।

২/ আল্লাহর নাম সমূহ উচ্চারণ করা। আল্লাহর নামে আল্লাহকে স্মরণ করার ফলে দয়াময় আল্লাহ।ইচ্ছা করলে রোগ থেকে মুক্তি করে দিতে পারেন। আল্লাহর এ নামগুলো স্মরণ করতে পারেন, আর-রহিম, আল-কায়্যুম, আস-সাফি ইত্যাদি।

৩/ কুরআন এর সূরা হাসর, নাস এবং ইখলাস পড়ুন। এ দয়া গুলো পড়ে সবসময় নিজের শরীরে ফুঁ দেয়া।

৪/মেডীকেশন গ্রহণ করুন।

বিভিন্ন কারণে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে  এ রোগে আক্রান্ত রোগীকে কিছু অতিমানবীয় বা দুষ্ট জিন এর আক্রমণ বলা হয়ে থাকে। যা বেশিরভাগ সময়ে ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদুর মাধ্যমে করা হয়। যারা শ্রবণ, দৃষ্টি বা স্পর্শ করে অনুভব করা যায় না।  শয়তানের আধ্যাত্মিক শক্তির ফলে একজন সুস্থ মানুষের এ রোগ হতে পারে। যার ফলে তারা তাদের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করার মাধ্যমে এ রোগ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব।  আর নয়তো এ রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

2,793 total views, 3 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: