সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড-এক বৈচিত্রতার নাম

সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড

পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলিয়ে একটু নীড় খুঁজে বেড়ায় খুঁজে বেড়ায় কোলাহল বিশৃঙ্খলামুক্ত পরিবেশ।জলজ প্রানী, সামূদ্রিক প্রানীরাও এর ব্যতিক্রম নয়।সমূদ্রের বিশালতায় যেমন আমরা মুগ্ধ হই ঠিক তেমনই অবাক হই রহস্যে ঘেরা গভীরতায়।হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণীদের অবাধ বিচরণ এই সমূদ্রে।এই বিশাল সমূদ্রের কিছু অংশ প্রাণীরা প্রজননের জন্য বেছে নেয়।বঙ্গোপসাগরের কোলেও রয়েছে এমনই একটি প্রজনন অঞ্চল, বিলুপ্তপ্রায় কিছু সামূদ্রিক প্রানীদের অভয়ারণ্য সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড।

এটি বঙ্গোপসাগরের দোবলার চর দ্বীপের দক্ষিণাংশে ১৭৩৮ বর্গ কি.মি. এলাকা জুড়ে অবস্থিত। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের প্রস্থ ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার, তলদেশ তুলনামূলকভাবে সমতল এবং পার্শ্ব দেয়াল প্রায় ১২ ডিগ্রি হেলানো। প্রায় 900 মিটার গভীরতার এই সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডে রয়েছে ডলফিন, তিমি, হাঙ্গল এবং কচ্ছপের প্রাণীদের প্রজনন কেন্দ্র।

সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড কি?

বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানকে কৌনিকভাবে অতিক্রমকারী খাদ আকৃতির সামূদ্রিক অববাহিকাই হচ্ছে  সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড ।গঙ্গা -ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত বলে এটি গঙ্গা খাদ নামেও পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের আরও কিছু বদ্বীপমুখী খাদের নাম জেনে নিলে কিন্তু মন্দ হয় না ! যেমন সিন্ধু নদীর মোহনার অদূরে সিন্ধু খাদ, মিসিসিপি বদ্বীপের পশ্চিম পাশে মিসিসিপি খাদ।

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের উৎপত্তি নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। অবশ্য সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে যে, প্লাস্টোসিন যুগে (২০ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ বছর আগে) নিম্ন সমুদ্রপৃষ্ঠে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর পলির স্তূপ সরাসরি মহীসোপান প্রান্তে গিয়ে পড়তো। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের ঘোলাটে স্রোত ও নদী-প্রবাহের সম্মিলিত প্রভাবই সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড গঠনের জন্য দায়ী।

বাংলাদেশের প্রথম সামুদ্রিক সুরক্ষাকর এলাকা হিসেবে – সরকার ‘ সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড’ কে বিপন্ন সামুদ্রিক প্রজাতির প্রানীদের একটি শস্য ও প্রজনন অঞ্চল ঘোষণা করেছে। বন বিভাগ দ্বারা জারি করা একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানা যায় বিশ্বব্যাপী বিপন্ন কমপক্ষে পাঁচটি ডলফিন প্রজাতি এবং আটটি প্রজাতির তিমি রয়েছে এই অঞ্চলে।

বন্যপ্রাণী অ্যাক্ট ২০১২ অনুযায়ী, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডকে সুরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, যা সেখানে মাছ ধরার এবং অন্যান্য সমূদ্র তীর হতে দুরবর্তী বাণিজ্যিক কর্মকান্ড সীমিত করবে। এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের সমূদ্র তীর হতে দূরবর্তী জলের মধ্যে বসবাসকারী সিটিসিয়ান (ডলফিন, তিমি) প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য কাজ করে এমন একটি সংগঠন হচ্ছে ইসাবেলা ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহযোগিতায় এই সংগঠনটি সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডে সামূদ্রিক প্রানীজগত সম্পর্কে জানার জন্য নৌ অভিযান চালায়। ইসাবেলা ফাউন্ডেশন সেখানে তিনটি বিরল প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় প্রানী দেখতে পায়- মিঙ্কে তিমি, মাস্কড বোবলি আর ব্রীড তিমি।

সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডে প্রবেশের সময় প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিমোহিত হবেন সুন্দরবন আকরাম পয়েন্ট থেকে হিরণ পয়েন্ট যাওয়ার পথে। যা যা অবলোকন করবেন ইচ্ছে হলে নোট করে লিখে রাখতে পারেন।

 

সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড সামুদ্রিক জীব জগৎ
Image Source: The daily star

প্রানীদের অভয়ারণ্য সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড!

জাহাজ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির প্রানীকূল আর উদ্ভিদকূলের সৌন্দর্য দেখে পৃথিবীর সবচেয়ে বেরসিক মানুষও প্রকৃতির প্রেমে পড়া থেকে নিজেকে আটকে রাখতে পারবেন না।

উদ্ভিদ ও প্রানীকূল স্ব স্ব বিভাগে নিজেদের বৈচিত্র্য প্রকাশ করছে সেখানে। গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতা, সুন্দরী, গরান ইত্যাদি প্রজাতির বৃক্ষের যেন এক মিলনমেলা হচ্ছে সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড।

কেওড়া বনের এই গাছ থেকে সেই গাছে ছোটাছুটি করে বিভিন্ন  গাছের ফল খেয়ে বেড়ায় বানরেরা, কেওড়া গাছের শীর্ষে ঈগলের বসে থাকার দৃশ্য, সমূদ্রের তীরের কর্দমাক্ত আর বালিয়াড়ি জায়গায় হাড়গিলা সারস পাখি আর বকের দল বেঁধে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য এসব মনোরম দৃশ্য চোখের পলকে পলকে উপভোগ করা যায়। ঝুটিওয়ালা ঈগল, ধূসর মাথা বিশিষ্ট ঈগল আর বাজপাখিগুলো বিস্তীর্ণ আকাশের সবটুকু জুড়ে রাজত্ব করে যায়।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে আকরাম পয়েন্ট এবং হিরণ পয়েন্টের মাঝে আপনি ডলফিনের লাফালাফি দেখতে পাবেন। ব্রীড তিমির নাসারন্ধ্র দিয়ে পানির ফুয়ারা তৈরির অপরূপ মূহুর্ত যদি নিজের জীবনের ডায়েরিতে লিখতে চান তাহলে সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডে একটু বেরিয়ে আসুন। স্বচ্ছ নীল পানি, নির্মল বায়ু, শুভ্র  সাদা মেঘের সাথে ডলফিন আর তিমির খেলা এ যেন এক প্রকৃতির স্বর্গীয় রূপ !

সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ডে রয়েছে তিমির অবাধ বিচরণ। দৈত্যাকার প্রাণবন্ত তিমি দেখে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতে একটুও কুন্ঠাবোধ করবেন না আপনি। সাথে ফটোগ্রাফির ইচ্ছাটাও পূরণ করে নিতে  মনের আনন্দে। প্রকৃতির এই দারুণ সৃষ্টি মেলা বড় দায়। এগুলো ক্যামেরাবন্দী না করলে কি হয়! এখানে গতি কমিয়ে এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে জাহাজ চালানো হয়  যেন তিমি বা ডলফিনের চলাচলে কোন বিরক্ত বা অসুবিধা না হয়।

ব্রীড তিমি তো দেখা হলো। এবার দেখা পাবেন আরেকটি বিরল প্রজাতির তিমি মিঙ্কে তিমি। সাধারণ মিঙ্কে তিমি (বলাইনিপেট্রা অ্যাকুটোরোস্ট্রাটা) হল উত্তর প্যাসিফিকের সবচেয়ে ছোট বেলেন তিমি। এটি সম্পূর্ণরূপে উত্ক্ষিপ্ত হয় ৭.৫ মিটার দৈর্ঘ্য। এটি ঝাঁকে ঝাঁকে চলা ছোট মাছ এবং অমেরূদন্ডী প্রানী খায়। মিঙ্কে তিমির শরীরের নিচে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ টি গলার খাঁজ রয়েছে যা শিকারে আক্রান্ত হওয়ার সময় যথেষ্ট প্রসারিত হতে পারে। মিঙ্কে তিমি প্রায়শই একাকি থাকতে পছন্দ করে।

মাস্কড বোবলি “Sulidae” গোত্রের সবচেয়ে বড় সামূদ্রিক পাখি। এই প্রজাতিটি পূর্ব আটলান্টিক ছাড়াও গ্রীষ্মমন্ডলীয় মহাসাগরে দ্বীপপুঞ্জে দেখা যায়। এটি মাস্কেড গেনেট বা নীল-মুখোমুখি বুলি নামেও পরিচিত।

সেখানে প্রায় আরো ২০০কিলোমিটার এলাকার মধ্যে আপনি দেখতে পাবেন দুই প্রজাতির তিমি, ছয় প্রজাতির ডলফিন, ১০টি প্রজাতি সামুদ্রিক পাখি, এক প্রজাতির কচ্ছপ, ৩০টি প্রজাতি মাছ এবং পাঁচ প্রজাতির শেলফিশ । তাদের মধ্যে আকর্ষণীয় হলেন মিঙ্কে তিমি, ব্রীড তিমি, ইন্দো-প্যাসিফিক হিপব্যাক ডলফিন, ইরাবদি ডলফিন, স্পিনার ডলফিন, মাস্কেড বোবল, গ্রেট ব্ল্যাক-মাথাযুক্ত গল, ক্রিস্টেড টের্ন, হক্সবিল কচ্ছপ, হ্যামার-মোমেন্ট শার্ক, টুনা, গ্রুপার এবং সাঁতারো কাঁকড়া ইত্যাদি। জেলেদের জালে ধরা পড়ে  মলাস্কা পর্বের বিলুপ্তপ্রায় কিছু জীবন্ত শঙ্খ।

বঙ্গোপসাগরের একটি রহস্যময় সাবমেরিন ক্যানিয়ন হচ্ছে সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড যা ভৌগোলিকভাবে, জলবিদ্যায় এবং পরিবেশগতভাবে অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান।এখনো অনেক কিছুই অজানা অনেক কিছুই অনাবিষ্কৃত। সরকারি বেসরকারি উভয়ভাবে চলছে গবেষণা চলছে অভিযান। সময়ের পরিক্রমায় বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের স্বস্তির আবাস হবে সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড !

4,089 total views, 6 views today

0 thoughts on “সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড-এক বৈচিত্রতার নাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: